বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 6

আনোয়ারা: বাংলা সাহিত্যে এক কালজয়ী মহাকাব্য

বাঙালি মুসলমান সমাজে সাহিত্য পাঠের ইতিহাসে মীর মশাররফ হোসেন রচিত ‘বিষাদ সিন্ধু’ এক অবিস্মরণীয় নাম। কিন্তু জনপ্রিয়তা এবং পাঠসংখ্যার বিচারে এই মহাকাব্যিক রচনার ঠিক পরেই যে উপন্যাসটির নাম সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়, তা হলো মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন রচিত কালজয়ী সামাজিক উপন্যাস ‘আনোয়ারা’। ১৯১৪ সালের ১৫ জুলাই (১৩২১ বঙ্গাব্দ) কলকাতা থেকে প্রথম প্রকাশিত এই উপন্যাসটি শতবর্ষ পেরিয়ে আজও তার আবেদন হারায়নি। ২০১৪ সালে এই ধ্রুপদী রচনার শতবর্ষ পূর্তি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয়।

রচনার নেপথ্যে এক করুণ ও অনুপ্রেরণাদায়ক ইতিহাস

‘আনোয়ারা’ উপন্যাসটি প্রকাশের ইতিহাস বেশ সংগ্রামমুখর। পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত থাকলেও অর্থাভাবে লেখক মোহাম্মদ নজিবর রহমান তা মুদ্রণ করতে পারছিলেন না। এই সংকটকালে রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী জুনিয়র মাদ্রাসার ছাত্ররা মিলে তাকে ৩০০ টাকা আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন। পরবর্তীতে তামাকের ব্যবসায় ভাগ্যক্রমে লেখক ৭০০ টাকা লাভ করেন। ছাত্রদের সাহায্য এবং নিজের অর্জিত টাকা মিলিয়ে মোট ১০০০ টাকা মখদুমী লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী খান বাহাদুর মোবারক আলীকে প্রদানের মাধ্যমে উপন্যাসটি আলোর মুখ দেখে।

জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা

জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে ‘আনোয়ারা’ বাংলা সাহিত্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত। প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান তাদের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে বলেছেন:

“জনপ্রিয়তা দিয়ে যদি কোন বইয়ের বিচার করতে হয়, তাহলে মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত ‘আনোয়ারা’র দাবিই সর্বাগ্রে বিবেচ্য। ১৯১১ থেকে ১৪ সালের মধ্যে এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৪৯ সালে এ বইটির ত্রয়োবিংশতি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এবং এ যাবৎ ‘আনোয়ারা’র দেড়লক্ষ কপি নিঃশেষিত হয়েছে।”

পরিসংখ্যানও এর সত্যতা নিশ্চিত করে। ১৯৪৯ সালের মধ্যেই এর ২৩টি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং প্রায় দেড় লক্ষ কপি নিঃশেষিত হয়। ১৯৬১ সালে এর ২৭তম সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার সময় পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ লক্ষ কপি বিক্রয় হয়েছিল। বর্তমানে কলকাতা ও ঢাকা মিলিয়ে এর ৬০টিরও বেশি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। একসময় এই উপন্যাসটি পাঠ্য-তালিকাভুক্তও ছিল।

জীবনবোধ ও কাহিনীর রূপরেখা

সপ্তদশ শতাব্দীর গ্রামীণ বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজের নিখুঁত পারিবারিক চিত্র এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। কাহিনীটি অত্যন্ত স্নিগ্ধ, সরল এবং জীবনমুখী; যেখানে কোনো কৃত্রিম জটিলতা নেই।
উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আনোয়ারা। বারো বছর বয়সে মা হারানোর পর বিমাতার (গোলাপজান) নিষ্ঠুর নির্যাতনে তার জীবন রক্তাক্ত হয়েছে। তবে স্নেহশীলা দাদীমার মমতা তাকে রক্ষা করেছে। বিবাহিত জীবনেও ভাগ্য বারবার তার ওপর আঘাত হেনেছে। তবে আনোয়ারার চরিত্রের প্রধান শক্তি ছিল তার অটুট ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পরম করুণাময়ের প্রতি অবিচল নির্ভরতা। আনোয়ারার শৈশব থেকে শুরু করে তার জীবনের পূর্ণতা প্রাপ্তি পর্যন্ত এই উপন্যাসের ব্যপ্তি।

চরিত্র চিত্রণ ও সামাজিক প্রভাব

উপন্যাসটিতে আনোয়ারা ছাড়াও প্রায় অর্ধশত চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে:
* নূর ইসলাম: আদর্শবান নায়ক।
* হামীদা: আনোয়ারার সখী।
* গোলাপজান: বিমাতার নিষ্ঠুর রূপ।
* দাদীমা: মমতার প্রতীক।
* এছাড়াও উকিল সাহেব, সালেহা, রাতিস বাবু, লোভী নবা এবং অতিচালাক ফরমানের মতো চরিত্রগুলো কাহিনীর প্রয়োজনে স্বাভাবিকভাবে উঠে এসেছে।

লেখক সমকালীন মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা, ধর্মীয় পবিত্রতা এবং প্রেম-ভালোবাসাকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। চিরায়ত মূল্যবোধ যেমন—ন্যায়পরায়ণতা ও মমত্ববোধের কারণে এটি বাংলা সাহিত্যে ‘ক্লাসিক’ মর্যাদা পেয়েছে।

রূপান্তর ও পরিশিষ্ট

‘আনোয়ারা’র ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে ১৯১৭-১৯১৮ সালের মধ্যে এর সিকুয়্যাল বা পরিশিষ্ট হিসেবে ‘প্রেমের সমাধি’ প্রকাশিত হয়, যা মূল উপন্যাসের মতোই জনপ্রিয় হয়েছিল।

এছাড়া বিভিন্ন মাধ্যমে উপন্যাসটির সফল রূপান্তর ঘটেছে:

* চলচ্চিত্র: ১৯৬৭ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান এটি অবলম্বনে ‘আনোয়ারা’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। রাজ্জাক ও সূচন্দা অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি মাইলফলক হয়ে আছে। আলতাফ মাহমুদের সঙ্গীত পরিচালনায় এতে কণ্ঠ দেন সাবিনা ইয়াসমিন ও শাহনাজ বেগমের মতো কিংবদন্তিরা।

* টেলিভিশন: ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) উপন্যাসের ধারাবাহিক নাট্যরূপ সম্প্রচার করে।

উপসংহার

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক বলেছিলেন, “সব সত্য সুন্দর নয়।” তেমনিভাবে সব বই আমাদের প্রকৃতভাবে আলোকিত করে না। তবে ‘আনোয়ারা’ এমন একটি বই যা শত বছর ধরে বাঙালি পাঠকদের মনন ও নৈতিকতাকে আলোকিত করে চলেছে। এর সহজবোধ্য ভাষা এবং জীবনমুখী দর্শন আজও আমাদের ভালো বই পড়ার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।

হরিদাসের গুপ্তকথা : ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ নামের বইটি বেশ দুষ্প্রাপ্য। বইটি সম্পর্কে অনেকের ধারণা যে এটি বোধহয় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আপাত নিষিদ্ধ ধরনের কোন বই। কিন্তু বইটি এককালে বেশ জনপ্রিয় ছিল। বইটির লেখক শ্রীভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩১০ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ মোটামুটি ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে। নিঃসন্দেহে বইটি তারও আগে লেখা হয়েছিল। আর কাহিনীর ঘটনাক্রম তারও বেশকিছু বছর আগেকার। উপন্যাসটি চার খণ্ডে বিভক্ত।

কাহিনীর নায়ক হল হরিদাস নামের একটি ছেলে। কাহিনীর আরম্ভের সময়ে তার বয়স চোদ্দ বছর। মোটামুটি হিসাব করে দেখা যায় তার জন্ম ইংরেজি ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। হুগলি জেলার সপ্তগ্রামে চোদ্দ বছর বয়েসে হরিদাসের যাত্রা শুরু হয় এক গ্রামের পাঠশালা থেকে। সে নিজের কোন পরিচয় জানত না। পাঠশালার গুরুমশাইয়ের বাড়িতে সে লালিত। গুরুমশাইয়ের মৃত্যুর পর সে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে বাধ্য হয়। এরপর সাত-আট বছর নানা ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে দিয়ে এই দরিদ্র সহায় সম্বলহীন অনাথ বালক কিভাবে নিজের পরিচয় জানল এবং পরিশেষে বিরাট ধনী জমিদারে পরিণত হল তারই রোমাঞ্চকর আখ্যান এই বই।

উপন্যাসটিতে হরিদাসের নায়িকাও উপস্থিত। তার নাম অমরকুমারী। নানা বিপত্তি পেরিয়ে শেষ অবধি হরিদাস এবং অমরকুমারীর মিলন হয়।

উপন্যাসটিতে প্রচুর চরিত্র। উপন্যাসের শেষপ্রান্তে এসে প্রতিটি চরিত্রেরই পরিণাম দেখানো হয়েছে। নানা রকম নাটকীয়তায় ভরপুর এই উপন্যাস। শেষে এসে সব কিছুকেই একটি বিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব রহস্যেরই সমাধান করা হয়েছে। বইটিকে একটি অ্যডভেঞ্চারের গল্প বললেও ভুল হয় না। প্রায় ৬৮০ পাতার বইটিতে প্রচুর রোমাঞ্চকর ঘটনার সন্নিবেশ ঘটেছে। নানা রকম চুরি, ডাকাতি, জালিয়াতি, খুন-খারাপি, আত্মহত্যা, কিডন্যাপিং, পুলিশ-দারোগা, মামলা-মোকদ্দমা, ভূতুড়ে ঘটনা এবং ষড়যন্ত্রের ঘটনায় ঠাসা। সিপাহী বিদ্রোহের চাক্ষুষ বর্ণনাও এতে স্থান পেয়েছে।

ঊনবিংশ শতকের বাঙলি এবং ভারতীয় জীবনের নানা বিচিত্র ঘটনার বর্ণনা এতে রয়েছে। এর সাথে আরো যুক্ত হয়েছে নানা রকম কেচ্ছা এবং ব্যাভিচারের ঘটনা। এবং প্রেমের ঘটনাও কিছু কম নেই। তখনকার সমাজব্যবস্থার একটি বাস্তব চিত্র দেখা যায়। বাঙালি বাড়িতে ব্যভিচারের ঘটনা যে কত বেশি ছিল তার বর্ণনা পড়লে অবাক হতে হয়। অনেক পুরুষই কোন আত্মীয় মহিলার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রাখতেন এবং অনেক সময়ে বিপদে পড়লে তাদের নিয়ে গৃহত্যাগও করতেন। বেশিরভাগ সময়েই তাঁরা বারাণসীর মত কোন তীর্থস্থানে গিয়ে নাম পরিচয় এবং সম্পর্ক ভাঁড়িয়ে থাকতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সম্মানও আদায় করতেন।

লেখক লিখছেন যে– “বাঙ্গালীদলের বেশী কলঙ্ক। জাতিতে জাতিতে, জাতিতে বিজাতিতে, সম্পর্কে সম্পর্কে, সম্পর্কে নিঃসম্পর্কে, বাঙ্গালী নর-নারী পাপলিপ্ত হলেই নিরাপদের আশাতে কাশীতে পালিয়ে আসে; মাতুলের ঔরসে ভগিনী-পুত্রী, পিতৃব্যের ঔরসে ভ্রাতৃকুমারী, ভ্রাতার ঔরসে বিমাতৃকুমারী, ভাগিনেয়ের ঔরসে মাতুলানী, জামাতার ঔরসে শ্বশ্রু-ঠাকরানী, শ্বশুরের ঔরসে যুবতী পুত্রবধূ গর্ভবতী হলেই কাশীধামে পালিয়ে আসে! গর্ভগুলি নষ্ট কোত্তে হয় না, কাশীর পবনের প্রসাদে বংশ-রক্ষা হয়।”

মনে রাখতে হবে এই বর্ণনার সময়কাল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহেরও আগের! খুনোখুনির ঘটনাও বেশ কিছু আছে। আর আছে সেই সময়ের ভালো-খারাপ পুলিশ এবং বিচার ব্যবস্থার বর্ণনা। উপন্যাসটিতে পুলিশকে বেশ করিৎকর্মা হিসাবেই দেখানো হয়েছে। তবে তারা যে উৎকোচ গ্রহনেও সিদ্ধহস্ত তার ঈঙ্গিতও রয়েছে।

কাহিনীর পটভূমিকাও বদলেছে বারে বারে। তৎকালীন ভারতবর্ষের নানা তীর্থস্থানের বর্ণনাও এতে রয়েছে। পশ্চিমের গুজরাট থেকে আরম্ভ করে পূর্বের ত্রিপুরা পর্যন্ত উপন্যাসটির ব্যাপ্তি। কাহিনী ছুঁয়ে গেছে ভারতের বিভিন্ন শহর যেমন বরোদা, আমেদাবাদ, আগ্রা, মথুরা, বৃন্দাবন, পাটনা, বারাণসী, কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, বর্ধমান, কানপুর, গৌহাটি। এই কাহিনী যে সময়ের সেই সময়ে ভারতে রেলপথ ছিল না বা সবে স্থাপিত হতে আরম্ভ করেছে। তাই বিভিন্ন স্থানে যাওয়াও অনেক কষ্টকর ছিল এবং তাতে বিপদের ভয়ও ছিল যথেষ্ট।

হরিদাসের নিজের বক্তব্য ও মন্তব্য থেকে লেখকের ব্যক্তিতের বিষয়েও জানতে পারি। ইংরেজ শাসন বিষয়ে তিনি বেশ খুশি তবে সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে তিনি উভয় পক্ষেরই নৃশংসতার জন্য সমালোচনা করেছেন। রানী ভিক্টোরিয়াকে তিনি ভক্তি করতেন। তিনি ছিলেন বাল্যবিবাহ এবং জাতিভেদ প্রথার একজন সমর্থক। এবং অসবর্ণ বিবাহ প্রথার বিরোধী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৎ এবং উপকারী।‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ একটি উপন্যাস হলেও পড়লেই বোঝা যায় যে এটির পিছনে অনেক সত্য, লেখকের নিজের চোখে দেখা ঘটনাও রয়েছে। এটিকে একটি ঐতিহাসিক বিবরণও বলা যায়। তাই ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগের একটি চমৎকার বর্ণনা আমরা পাই।